বিবিধ

যাকাত দেওয়ার নিয়ম ২০২২ । যাকাত হিসাব কিভাবে বের করবেন জেনে নিন

যাকাতের পরিপূর্ণ অর্থ হলো পবিত্রতা। যাকাত এজন্যই প্রদান করা হয় যাতে আপনার মন পবিত্রতা অর্জন করে, সম্পদের বৃদ্ধি ঘটে এবং সম্পদ পরিষ্কার হয়। যাকাতের আরো পরিভাষা রয়েছে যেমন:  যাকাত হলো আমাদের সম্পত্তির সেই ভাগ যা আল্লাহতালা গরিবদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য যাকাত হচ্ছে একান্ত কর্তব্য ও ফরজ। সমাজের ধ্বনি ও স্বচ্ছল লোকদের  বাড়তি সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিত আদায় করে দরিদ্র ও বঞ্চিত লোকদের মধ্যে যথাযথ বন্টন করাই কর্মসূচির প্রধান বৈশিষ্ট্য। যাকাতের কথা কোরআনে কোন কোন মতে ৩২ বার এবং অধিকাংশের মতে ৮২ বার উল্লেখ রয়েছে।

পবিত্র কুরআন বলে – তোমাদের বন্ধুতো একমাত্র আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং মুমিন বান্দা, যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র (সূরা মায়েদা আয়াত – ৫৫)

যাকাত আদিকাল থেকে প্রচলিত ছিল। ধন-সম্পদের যে নির্ধারিত অংশ শরীয়তের বিধান মোতাবেক আল্লাহর পথে ব্যয় করা মানুষের উপর ফরয করা হয়েছে তাকে যাকাত বলে। ( ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২১ খন্ড, ৪৭৫ পৃ:)

কারূনের ধ্বংস এসেছিল যাকাত প্রদান না করে কার্পণ্য করার কারণে,
ইয়াহুদী বণী ইসরাঈল হতে গৃহিত প্রতিশ্রুতিতে মহান আল্লাহ বলেনঃ
তোমরা সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত দিবে (সুরা বাকারা আয়াত ১১০);

পবিত্র কুরআনে এসেছে, ঈসা (আঃ) বলেন,  তিনি আমাকে আজীবন সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা মারইয়াম আয়াত ১৩)

ইসমাঈল (আঃ) সম্পর্কে বলা হয়েছে

তিনি তার পরিবার পরিজনদের সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিতেন (সুরা মারইয়াম আয়াত ৫৫)

যাকাতের উদ্দেশ্য

তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ করো যাতে, তুমি সে গুলোকে পবিত্র করতে এবং সে গুলোকে বারাকাত করতে পারো এর মাধ্যমে (সূরা তাওবা, আয়াত ১০৩)

শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করলে, আখেরাতে এর উত্তম বদলা পাবেন এবং ইহকালে ও তার ধন সম্পদ কখনো শেষ হবে না। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বা লোকে মস্ত বড় দাতা বলে প্রশংসা করুক বা আর্থিক কোনো প্রয়োজনে দান করলে আল্লাহ পাক কবুল করবেন না।

আরো দেখুনঃ  যাকাত ক্যালকুলেটর ২০২২ । যাকাতের সঠিক হিসাব করার পদ্ধতি ২০২২

যাকাত একটি নৈতিক ব্যবস্থাও। কেননা ধনী লোকদের  মানসিকভাবে লোভ, কার্পণ্য, আত্মগরিমার ময়লা ও আবর্জনা থেকে পবিত্র করা এবং বদান্যতা, দানশীলতা ও কল্যাণে তাদের পরিশুদ্ধতায় ভরপুর করে দেয়। অন্য লোকদের দুঃখ-দুর্দশায় সহানুভূতি ও দয়া মায়া সহকারে তাদের সাথে একাত্ম করে তুলে।

বঞ্চিতদের অন্তরে যে হিংসার আগুন জ্বলে  ওঠে, তা নিভিয়ে দিতে যাকাত বিরাট কাজ করে।  ধনীদের সুখ সম্পদ দেখে তাদের মনে যে কষ্ট অনুভব করে যাকাত তা প্রশমিত করে দেয়।

ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হচ্ছে যাকাত।মূলত রমজান মাসে সাধারণত মানুষ যাকাত প্রদান করে। কিন্তু যাকাত আসলে কতটা দিতে হয় অর্থাৎ মানুষের স্থাবর সম্পত্তি না অস্থাবর সম্পত্তি নাকি স্থাবর-অস্থাবর উভয়ের উপর ধার্য, তা অনেকেরই অজানা।

যাকাত কাদের উপর ফরজ?

১: মুসলমানদের উপর ফরজ:  যাকাত আমাদের ইসলাম ধর্মের তৃতীয় স্তম্ভ। মুসলমান সমাজের জন্য যাকাতকে ফরজ করে দেওয়া হয়েছে। এবং নির্দিষ্ট সম্পদের মালিক হলেই আপনাকে যাকাত দান করতে হবে।

২: দাসত্বে না থাকা:  আপনি যদি স্বাধীন ব্যক্তি হন অর্থাৎ আপনি যদি কারো দাস না হন, তবে আপনার উপর যাকাত ফরজ।

৩: নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকা: কার ওপর তখনই যাকাত ফরজ হবে, ইসলামিক শরীয়ত অনুযায়ী তার নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে। এই সম্পদগুলি হতে পারে টাকা, স্বর্ণ-রৌপ্য, শস্য ও প্রাণী।

৪: ঋণ মুক্ত হওয়া : ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির উপর যাকাত ফরজ হবে না। যাকাত ফরয তখনই হবে, যখন আপনি আপনার পাওনাদারকে সম্পূর্ণ টাকা বুঝিয়ে দিয়ে ঋণ মুক্ত হয়ে আপনার যাকাত আদায় করবেন।

যাকাত কোথায় ও কাকে দিতে হবে

এ সম্বন্ধে আল্লাহতা’লা বলেন সাদাকা পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন কেবলমাত্র ফকির-মিসকিন, যাকাত সংগ্রহকারী, যাদের অন্তরে ইসলামের প্রতি ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা আছে, আর ক্রীতদাস মুক্তিতে ঋণগ্রস্ত, আর যারা আল্লাহতালার রাস্তায় আছে, আর রাস্তার পথিক। এটা আল্লাহর তরফ থেকে ফরজ। আল্লাহতালা সমস্ত কিছু জ্ঞাত আছেন আর তিনি হেকমতওয়ালা (সূরা: তওবা আয়াত: ৬০

এখানে আট ধরনের লোককে যাকাত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে

১) ফকির: যা তার প্রয়োজন তা তার কাছে একেবারেই নেই।
২) মিসকিন:  মিসকিন ফকিরের চেয়েও উত্তম। যেমন : তার প্রয়োজন ১০ টাকা, কিন্তু তার আছে মাত্র ৭ টাকা। আল্লাহ বলেন, ” আর ওই নৌকা যা ছিল কয়েকজন মিসকিনের, যারা সমুদ্রে কাজ করতো”। (সূরা: কাহাফ আয়াত: ৭৯)

আরো দেখুনঃ  যাকাত ক্যালকুলেটর ২০২২ । যাকাতের সঠিক হিসাব করার পদ্ধতি ২০২২

৩) যাকাত সংগ্রহকারী:  তারা হলেন কোন দেশের ইমাম বা তাদের নায়েব কর্তৃক নিযুক্ত লোকসকল। তাদের মধ্যে আছে: মাল জমাকারী, হেফাজতকারী, লেখক, হিসাবরক্ষক, পাহারাদার, এক স্থান হতে অন্য স্থানে পরিবহনকারী এবং বিলিবন্টনকারী। তাদের যাকাতের মাল দেয়া যাবে। যদি কোন ধনী লোক স্বেচ্ছায় এ কাজে আত্মনিয়োগ করে এবং উপরোক্ত ব্যক্তির কারো জীবন যাপনের অন্য ব্যবস্থা থাকে তারা স্বেচ্ছায় কিছু পারিশ্রমিক নিতে পারবেন বেতন হিসেবে। তবে তাদের যাকাত দেওয়া নেওয়া বৈধ নয়। আর বনু হাশেম গোত্রের হলে যাকাত দেওয়া যাবে না।
রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “নিশ্চয়ই যাকাত ও সদাক্বাহ মুহাম্মদ (সাঃ) এর বংশধরদের জন্য নয়”। (মুসলিম, মিশকাত হাদিস ১৭৩১/৩)

৪) যাদের অন্তর ইসলামের দিকে ঝুঁকেছে:  যে সমস্ত গরিব বিধর্মী ইসলাম গ্রহন করতে চায় বা মুসলিমদের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে চায়, তাদের  যাকাত দেওয়া যাবে। যেমন: সফওয়া ইবনু উমাইয়াকে হুনাইন যুদ্ধের গণীমাত দিয়েছিলেন । রাসুল (সাঃ) আবু সুফিয়ান ইবনু হারবকে দিয়েছিলেন । আক্‌বা ইবনু হাবেসকেও দিয়েছিলেন । উয়াইনাহ ইবনু মিহসান কেও দিয়েছিলেন (মুসলিম)

৫) ক্রীতদাস  মুক্তিতে: ক্রীতদাস মুক্ত করা, মুক্তির ব্যাপারে লেখক, শত্রুর হাতের বন্দী মুক্ত করা ইত্যাদি কাজে যাকাতের টাকা দিয়ে সাহায্য করা যায়।

৬) ঋণগ্রস্থ: যারা ঋণগ্রস্থ এবং শোধ করার সামর্থ্য নেই তাদের যাকাতের টাকা দিয়ে সাহায্য করা যাবে।

৭) যারা আল্লাহর রাস্তায় আছেন: যারা দ্বীন প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেছে। যেমন: কোন বিষয়ে কোরআন হাদিস সংগ্রহ করে বই আকারে বিনামূল্যে বিতরণ করে, যারা কোনরকম হাদিয়া ছাড়াই ওয়াজ নসিয়ত  করে, কোন এতিমখানা বা কোন গরীব সন্তান মাদ্রাসায় পড়ানোর জন্য, যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে, ইত্যাদি ক্ষেত্রে যাকাত দেওয়া যাবে।

আরো দেখুনঃ  যাকাত ক্যালকুলেটর ২০২২ । যাকাতের সঠিক হিসাব করার পদ্ধতি ২০২২

৮)  রাস্তার পথিক: ওই মুসাফির যে একস্থান হতে অন্য স্থানে বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়েছে। কিন্তু টাকার অভাবে নিজ গৃহে যেতে পারছে না। তাকে ওই পরিমাণ যাকাত দেওয়া হবে, যাতে নিজ গৃহে ফিরে আসতে পারে। যদি কোথাও ধার-কর্জ পায় তবে যাকাত নিতে পারবে না।

কতটুকু পরিমান যাকাত দেয়া যাবে

ফকির, মিসকিনদের জন্য খানা, পোশাক, বাসস্থান এবং অন্যান্য জিনিস যা ছাড়া বাঁচা সম্ভবপর নয়, তবে কোনো অতিরিক্ত খরচ করা চলবে না। যদিও এর পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ যা দিয়ে এক ব্যক্তির চলে, অন্যত্র অন্য ব্যক্তির চলবে না। যা একজনের 10 দিনের খরচ তা অন্যজনের এক দিনের খরচ। তবে সর্বোত্তম ব্যবস্থা হল:  অসুস্থর চিকিৎসার জন্য কোন খরচ দেওয়া, অবিবাহিতদের বিয়ের জন্য খরচ দেওয়া এবং যাকে যাকাত দেওয়া হয় ভবিষ্যতে যাতে আর যাকাত নিতে না হয় এরকম ব্যবস্থা করে দেওয়া।  যেমন : কোন কর্মের ব্যবস্থা করে দেওয়া, এমন কিছু দেওয়া যা দিয়ে সে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। যেমন: রিকশা-ভ্যান, গরু ছাগল, হাঁস মুরগির, খামার ইত্যাদি সেবা দেওয়া যায় তার আর্থিক সচ্ছলতা আসে।

সাহাবীরা এমন পরিমানে যাকাত দিতেন পরিবর্তীতে সে লোকের আর যাকাত নেওয়ার প্রয়োজন হয় নাই ।

খলীফা উমার (রাঃ) এর আমলে যাকাত বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এত সুন্দর ভবে রূপায়িত হয়েছিল যে, সারা দিন ঘুরেও যাকাত নেয়ার মত লোক খুজে পাওয়া যেত না । খলিফাহ উমার বিন আব্দুল আজিজ (রাঃ) এর সময়েও এরূপ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল । তিনি যাকাত নেবার লোক না পেয়ে শেষে আফ্রিকা মহাদেশে গিয়ে যাকাত বন্টনের আদেশ দিয়েছিলেন । ইসলামের আবির্ভাবের পর হতে চার খলীফাহ ও পরবর্তী কোন কোন খলীফাহর খিলাফত কালে যেভাবে যাকাত আদায় ও বন্টন করা হতো।

কাদের যাকাত দেওয়া যাবে না

রাসূলুল্লাহ (সা:)  বলেছেন, ধনী বা কর্মক্ষম যারা তাদের যাকাতে কোন অংশ নেই। (আহমাদ, আবু দাউদ, নাসায়ী, মেশকাত হাদিস ১৭৩৮/১০) 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button